মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ

সরিষার ফসলে তিন কিস্তিতে ইউরিয়া সার কি সমান ভাবে দিতে হবে?

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। সরিষা গাছে সাধারণত দুই বারে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়া সারের অর্ধেক ও অন্যান্য সার বপনের আগে অর্থাৎ জমি তৈরির সময় এবং বাকি অর্ধেক ইউরিয়া সার গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের সময় মাটিতে যাতে রস থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।

শুকনা বীজতলায় ধানের চারা তৈরি

আবহমানকাল থেকে কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। দেশের শতকরা প্রায় ৭০-৭৫ ভাগ লোক কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষতি ও পরোক্ষতিভাবে সম্পৃক্ত। দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে অন্যান্য চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রতিনিয়ত কমছে। সে সঙ্গে সামপ্রতিক সময়ে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও বিশ্বব্যাপী  জলবায়ু পরিবর্তন, যার ফলশ্রুতিতে প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে সিডর, আইলা, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের। কৃষি ক্ষেত্রে এ ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক। এ অবস্থায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা তথা খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলতে সত্যিকার অর্থে এ দেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

তাছাড়া বৃষ্টিনির্ভর খরিফ-১ ও ২ এ দানাদার ফসল (আউশ, আমন) উৎপাদনও বৃষ্টিপাতের অভাবে সেচ নির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যবস্থায় বাড়তি খরচ হচ্ছে, অন্য দিকে প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করে কাংখিত ফলনও আশানুরূপ পাচ্ছে না। তদুপরি, আছে খরা, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ অবস্থায় রবি মৌসুমে বোরো উৎপাদনই  (দানাদার ফসলের মধ্যে) কৃষকের একমাত্র ভরসা। কারণ এ ফসল প্রাকৃতিক দুর্যোগমুক্ত অর্থাৎ Safe and Secure অথচ সেচ নির্ভর এ ফসল উৎপাদনে কৃষকদের  সর্বশক্তি নিয়োগ করেও কাংখিত ফল পাচ্ছে না।  ফলনের তারতম্য দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। গবেষণালব্দ সব প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করার পরও কৃষক কাংখিত ফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার কারণে বিভিন্নতার মাঝে দেখা যায় যে, বোরো মৌসুমে ‘চারার অধিক বয়স ১০০-১১০ দিন অন্যতম’। সারা দেশে দেখা যায় যে, হয়ত আগাম/দেরি বীজতলা তৈরি যা ঠাণ্ডা বা গরমে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

 
এ অবস্থায় গত বোরো মৌসুমে পলিথিনে আবৃত বীজতলা প্রযুক্তি ব্যবহার করে একদিকে যেমন প্রায় ৫০% বীজ কমিয়ে আনা সম্ভব, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ঠিক রেখে ফলন কমপক্ষে ২৫-৩০% বৃদ্ধি সম্ভব।
 
 বীজতলা প্রস্তুত প্রণালি
 
১. মাটিতে  প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা সম্পন্ন যে কোন শুকনা স্থানে করা যায়, তবে মাটি দো-আঁশ বেলে দো-আঁশ হওয়া উত্তম।
২. আদর্শ বীজতলা তৈরি করে অংকুরিত বীজ ছিটিয়ে গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। (যেভাবে পেঁয়াজ / মরিচ/ বেগুনের বীজতলা করা হয়)।
৩. সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ বীজতলা পলিথিন (কালো পলিথিন ব্যতীত) দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
৪. প্রতি বর্গমিটারে ৫০-৬০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
৫. ২০-২৫ দিন ঢেকে রাখলে ধানের চারাগুলো রোপণ উপযোগী হবে।

পলিথিনে আবৃত  শুকনা বীজতলা প্রযুক্তি ব্যবহারে সুবিধাগুলো:
 
১. সুস্থ সবল ২৫-৩০ দিনের চারা উৎপাদন সম্ভব,
২. অধিক শীতে এমনকি শৈত্যপ্রবাহেও চারার কোন ক্ষতিতি হয় না।
৩. বীজতলায় বীজের পরিমাণ প্রায় ৫০% কম লাগবে। চারা উত্তোলনে শ্রম ব্যয় খরচ এক চতুর্থাংশে নেমে আসবে।
৪. শিকড় এলাকা খুবই মজবুত থাকে বিধায় রিকভারি স্টেজ খুবই কম সময়ে উত্তীর্ণ হয়,  যার ফলে রোপণকৃত চারার অঙ্গজ বৃদ্ধি তথা প্রয়োজনীয় কুশি উৎপাদনে প্রচুর সময় পায়।
৫. ফলন ২৫-৩০% বেশি পাওয়া সম্ভব।
 
প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্কতা:

 
১. অতিরিক্ত শীতে কোনক্রমেই পলিথিন সরানো যাবে না।
২. বীজতলায় রসের অভাব হলে স্প্রে করে হালকা সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. পলিথিন নিচে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে পলিথিন ২/৩ ঘণ্টা সরিয়ে দিতে হবে (বাহিরের চেয়ে ৫-৬ সে.)
৪. রোগে আক্রান্ত হলে নিয়ম অনুযায়ী রোগনাশক স্প্রে করতে হবে তবে ব্যবহারের পর ২-৩ ঘণ্টা পলিথিন তুলে আলো/রোদ লাগাতে হবে।
৫. চারা শক্ত (Hardening) করার জন্য মূল জমিতে রোপণের ৩-৪ দিন আগে দৈনিক ২-৩ ঘণ্টা পলিথিন তুলে দিতে হবে।
৬. প্রতি গোছায় ২টি করে চারা রোপণ  আবশ্যক।
৭. জমিতে ছিপছিপে পানি রাখতে হবে ১০-১৫ দিন।
৮. ওই সময়ে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের উপযুক্ত সময়।
৯. যে দিন চারা উঠানো হয় সে দিন বীজতলা থেকে চারা উত্তোলনের পর পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটে চারার গোড়া চুবিয়ে রোপণ করা উত্তম। (২ গ্রাম পটাশিয়াম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে)
১০. নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

শুকনা এবং ভিজা বীজতলা তৈরির কৃষক পর্যায়ে খরচের বিশ্লেষণ (৩ শতাংশে):
   
কৃষক পর্যায়ে এক জরিপে দেখা যায়, পলিথিনে আবৃত শুকনা বীজতলা স্থাপনে বীজ, শ্রমিক, সার, পলিথিন বাবদ ৩ শতক জমির জন্য খরচ ৩৪৫৭ টাকা। অথচ ভিজা বীজতলা স্থাপনে খরচ হয় ৪৮৩০ টাকা।  প্রতি ৩ শতক বীজতলায় খরচের পার্থক্য ১৩৭৩ টাকা অর্থাৎ শুকনা বীজতলার ক্ষেত্রে ৩৯.৭১% খরচ কম হয়।
 
শুকনা ও ভিজা বীজতলার চারার মাধ্যমে রোপিত জমির তুলনামূলক উৎপাদন/লাভ/ক্ষতির বিবরণ (হেক্টরে):
 
কৃষক পর্যায়ে মাঠ জরিপে দেখা যায়, শুকনা বীজতলার চারা দিয়ে রোপিত প্রতি একর বোরো জমিতে উৎপাদন খরচ পড়ে ৩৬,৩৮২ টাকা এবং ফলন ৩.১৩ মেট্রিক টন/একর হিসেবে আয় হয় ৫৬,৩৪০ টাকা। অথচ ভিজা বীজতলার চারা দিয়ে রোপিত একরপ্রতি খরচ হয় ৩৬,৭৭৬ টাকা এবং ফলন ২.৬৭ মেট্রিক টন/একর হিসেবে  আয় হয় ৪৮০৬০ টাকা। মানিকগঞ্জ মডেলে শুকনা বীজতলার চারা দিয়ে বোরো  ধান উৎপাদনে একরপ্রতি ৮২৭৮ টাকা অতিরিক্ত আয় হয়।
 
ট্রায়াল প্লটে শুকনা ও ভিজা বীজতলার  চারা দিয়ে রোপিত বোরো ধানের ফলনের পার্থক্য-

শুকনা বীজতলা : ২১টি প্লটের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন-৮.২৬ মেট্রিক টন ধানে (৫.৫০ মেট্রিক টন চালে)।

ভিজা বীজতলা  : ২১টি প্লটের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন-৬.৭৬ মেট্রিক টন ধানে (৪.৫০ মেট্রিক টন চালে)। হেক্টরপ্রতি ফলন পার্থক্য : ১.৫ মেট্রিক টন ধানে (চালে ১.০০ মেট্রিক টন)।


উপসংহার : শুকনা বীজতলার স্বল্প বয়সের চারা দিয়ে রোপণের মাধ্যমে  বোরো ফসলের   ফলন ২৫-৩০% বৃদ্ধি পেতে পারে। এ প্রযুক্তিটি সারা দেশে প্রয়োগ করতে পারলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।  পাশাপাশি এ প্রযুক্তিটির মাধ্যমে গবেষণার নতুন নতুন দার উন্মুক্ত হতে পারে যা প্রয়োগের মাধ্যমে ধান গবেষণার ক্ষেত্রে  এক বিশেষ অবদান রাখতে পারে।

ছবি



Share with :

Facebook Twitter